Borhan IT https://www.borhanit.com/2020/12/blog-post_13.html

প্যারাসুট ছাড়া ভূমিষ্ঠ হয়েও যেভাবে বেঁচে যেতে পারবেন!

 মনে করুন আপনি সিঙ্গাপুর ভ্রমণ করার জন্য বিমানে উঠেছেন, আর বিমানে উঠে ঠিক করলেন আপনি দারুণ একটি ঘুম দিবেন আর পৌঁছে যাবেন সিঙ্গাপুর। যেই ভাবা সেই কাজ দিলেন একটা ঘুম। কিছুক্ষণ পর আপনি হঠাৎ চোখ খুলেই নিজেকে উড়ন্ত অবস্থায় উপলব্ধি করলেন!

কিন্তু কিসে উড়ছেন আপনার বিমান কোথায়! আপনার ডানা কোথায়!

এই অবস্থায় আপনার হঠাৎ "এড্রিন ব্রডির প্রেডাটর ২০১০" এর কথা মনে পড়ল, যে সে মুভির শুরুতে এইভাবে নিজেকে আকাশ থেকে পড়ন্ত অবস্থায় আবিষ্কার করতে পারল। আর প্রায় মাটিতে পড়ার মুহূর্তে তার প্যারাসুট ও খুলল।

এই ভেবে আপনিও প্যারাসুট খুলতে যাবেন। কিন্তু সে কী আপনার তো প্যারাসুট ও নেই! এই বুঝি ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল। একবার ভাবুন তো! 

 

না! আপনার হয়ত ভবলীলা সাঙ্গ হবে না। কারণ, ভেসনা ভুলোভিচকে নামের একজন বিমান যাত্রী ৩৩,০০০ ফিট উপর থেকে পড়ে বেঁচে গেছে। শুধু বাঁচেননি বরং দিব্যি গিনেসবুকে রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন।

তবে আপনি কেন পারবেন না? তাহলে তার গল্প শোনা যাক।

১৯৭২ সালে যুগোস্লোভিয়ান ডিসি-৯ বিমান দূর্ঘটনায় ভেসনা ভুলোভিচকে নামের এক নারী ৩৩,০০০ ফিট উচ্চতা থেকে পড়ে বেঁচে গিয়েছিলেন।

৩৩,০০০ ফিট উচ্চতার বিমানটি পতনের বিকট শব্দে স্থানীয় এক কাঠুরে দৌড়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে এক নারীর চিৎকার শুনতে পেলেন। এবং তার কাছে গিয়ে তাকে মুমূর্ষ অবস্থায় দেখতে পেলেন।

মুমূর্ষু ভেসনাকে দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। দেহের একাধিক অঙ্গে মারাত্মক আঘাত পাওয়া, ভগ্ন মেরুদণ্ড এবং করোটিতে ফাটল সৃষ্টি হওয়ায় তাকে বাঁচানো যাবে এমন আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা।

কিন্তু একবছর চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেন। এবং প্যারাসুট ছাড়া সর্বোচ্চ উচ্চতা থেকে বেঁচে যাওয়ার এক অন্যান্য বিশ্বরেকর্ড করেন।

৩৫ হাজার ফিট উচ্চতা!

এবার আসি মূলকথায়। ৩৫,০০০ ফিট উচ্চতা থেকে যদি একজন মানুষ পড়ে, তাহলে তার বেঁচে যাবার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু এই দুর্ভাগা সত্যকে স্বীকার করেই আমরা বলছি তবু আপনার বেঁচে যাবার একটা সম্ভাবনা আছে।

যদিও আমি বলব মহাকর্ষ শক্তি বা "Gravity" আপনার বিপক্ষে কাজ করছে, কিন্তু এই পরিস্থিতি আপনার পক্ষে কাজ করছে। কারণ, আপনি বিশ্বাস করেন বা না করেন, আপনি রাতে ইচ্ছেমতো মদ গিলে আপনার উঁচু ভবনের বারান্দা থেকে পড়ার পরের মৃত্যুর যে পরিমাণ ঝুঁকি রয়েছে, তার চেয়ে এই ঝুঁকি কিছুটা কম। এর কারণ ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করছি।

বিমানের স্বাভাবিক উচ্চতা ৩৫,০০০ ফিট উপর থেকে পড়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই আপনার অক্সিজেন ঘাটতি দেখা দিবে। আর শীগ্রই আপনার মধ্যে হাইপোক্সিয়া বা শ্বাস নিতে অসুবিধা এবং হাইপোক্সিয়ার দরুন আপনার শরীরের টিস্যু গুলো কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে। এবং আপনি অজ্ঞান ও হয়ে যেতে পারেন।

এছাড়া এই উচ্চতায় বিমানের বাইরের তাপমাত্রা -৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর এখানে আপনার ঠাণ্ডায় জমে যাবার ঝুঁকিও আছে, তবে এই ঠাণ্ডা আপনার ঘর্ষণের কারণে আপনাকে ততটা শাসন করতে পারবে না।

আপনাকে এই অবস্থায় একটা কথাই মনে রাখতে হবে যে, আপনার পরবর্তী গন্তব্য, স্থল ভূমি।

পড়ন্ত অবস্থায় আপনার গতিবেগ কেমন হবে?

ধরুন আপনি পড়ার সময় আপনার সাথে আপনার সীট টিও পড়ছে, অথবা বিমানেরই একটা অংশের সাথে আপনি পড়ছেন, আর না হয় আপনি একা পড়ছেন। একটা বিষয়ে কিন্তু আপনি কৌতূহল থাকবেন সেটা হলো প্রান্তিক বেগ। অভিকর্ষ আপনাকে যত বেশি টানবে আপনি তত দ্রুত পড়তে থাকবেন।

কিন্তু যদি আপনি আপনার সাথে কোনো বস্তু নিয়ে পড়তে থাকেন। তাহলে সেটির মধ্যাকর্ষনের সাথে আপনার গতি আরো বেশি বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

যখন ঊর্ধ্বমুখী শক্তি নিম্নমুখী শক্তির সমান হয়, তখন ত্বরন বন্ধ হয়ে যায়। আর সেজন্য নিজেকে যতটা সম্ভব হালকা রাখার চেষ্টা করুন।

আপনার আকার, আয়তন, ওজন এবং বায়ুঘনত্বের উপর নির্ভর করে আপনার গতি তখন প্রায় ১২০ মাইল প্রতি ঘন্টায়। যতবেশি গতিতে আপনি পড়বেন ততবেশি গতিতে আপনি মাটিতে আঘাত করবেন।

২২০০০ ফিট উচ্চতা!

২২,০০০ ফিট উচ্চতায় আসার পর আপনি মোটামুটি শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাসে এসে পৌঁছেছেন। এবার আপনার সামনের  গুরুত্বপূর্ণ ২ মিনিট শুরু হচ্ছে। এই ২ মিনিট পরে আপনি ভূমি থেকে ১,০০০ ফিট উচ্চতায় এসে পৌঁছাবেন। আপাতত এই অবস্থানে আপনার পরিকল্পনা সহজ, মাথায় একটাই ভাবনা থাকবে, যেমনটা ইতিহাসবিদ জিম হ্যামিল্টন বলেছেন। যে, “আপনি মরার জন্য পড়ছেন না,আপনি অবতরণ করার জন্য পড়ছেন”।   

নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা ভাবুন।

আপনার শরীরের পজিশন কী হবে?

এবার আপনার শরীরের অবস্থান ঠিক করুন। আপনার ত্বরনকে ধীর করতে, আপনার পা এবং দুই বাহু ছড়িয়ে দিন, মাথা এবং বুক মাটির দিকে রাখুন, এবং আপনার মাথা উঁচু করে রাখুন। মোটকথা আপনার শরীর ভূমির সমান্তরাল থাকবে।  

এতে আপনার শরীরে ঘর্ষণ বৃদ্ধি পাবে, এবং আপনার গতি কিছুটা ধীর করবে। আবার ঘুমিয়ে পড়বেন না। এটা আপনার ল্যান্ডিং পোজ নয় কিন্তু।

১০০০ ফিট উচ্চতা!

এবার ল্যান্ডিং পোজ ঠিক করুন। কিন্তু কীভাবে ল্যান্ডিং করবেন, এই প্রশ্ন তো থেকে গেল। তবে দুঃখজনক ভাবে এই বিপজ্জনক মুহূর্তের উত্তর টা এখনো বিতর্কিত।

তবে এত সব বিতর্কের মধ্যে ফেডারাল এভিয়েশন এজেন্সি ১৯৬৩ সালের একটি প্রতিবেদনে স্কাইডাইভারদের পজিশনকে ঠিক করেছে। সেটা হলো আপনার পা জড়ো করে রাখুন, পায়ের পাতা সোজা রাখুন, হাঁটু হালকা বেঁকে রাখুন। আর হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখুন।

এই পজিশনে বেঁচে থাকার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা আছে।

হাইওয়ে সেফটি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ১৯৭৭ সালের এক গবেষণায় দেখতে পেয়েছিলেন, যে বেশীরভাগ মৃত্যু পড়ার দরুন হয়, ভবন থেকে সেতু থেকে কিংবা লিফট চাপায়,

যদি আপনি নিজেকে পড়ন্ত অবস্থায় উপলব্ধি করতে পান, তাহলে আপনার সুদর্শন চেহারার মায়া ভুলে যান, আর নিজের চেহারার উপর আঘাত দিন, এটা আপনার মাথা এবং পশ্চাৎদেশ থেকে উত্তম।

 

কোথায় পড়বেন?

কোথায় পড়বেন সেটা তখন আপনি ঠিক করবেন না। সেটা ঠিক করবে আপনার নিয়তি। তবু আপনার মনে একটা প্রশ্ন থাকতে পারে যে, কোথায় পড়লে আপনি বাঁচতে পারেন। ফ্রেঞ্চ ট্রেন স্টেশনের পাথরের মেঝেতে ম্যাগির অবতরণ এক মুহূর্তের মধ্যে সব বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। তাহলে কি গ্লাসে পড়ার কথা ভাবছেন? না সেটিও বেদনাদায়ক। ঘাসেও একই কথা, গাছের উপর? এটি যদিও ভালো ব্যাপার। কিন্তু গাছের ঢাল ফুঁড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। বরফে? নাকি পানিতে? এতক্ষণে মনে হয় একটা উত্তর পেলেন।

জি না। যদি আপনি এটা ভেবে থাকেন,তাহলে আপনি ভুল। পানি কংক্রিটের মেঝের থেকেও বিপজ্জনক হতে পারে।কারণ কংক্রিটের সংকোচন ক্ষমতা আছে। পানির সংকোচন ক্ষমতা নেই।

যদি আপনার পানিতে পড়া সু-নিশ্চিত দেখতে পান, তাহলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিন এক্ষেত্রে আপনার জন্য যেটি ভালো হবে, তা হলো, মাথা নিচু করুন,দুই হাতের আঙ্গুল জড়ো করুন, হাতের বাহু দিয়ে মাথা ঢেকে রাখুন,এবার আপনি পড়ার জন্য প্রস্তুত।

যেখানেই আপনি পড়েন না কেন, কোন জায়গাতেই আপনি আপনার মাথায় আঘাত নিবেন না। হোক সেটা বিল্ডিং এর উপর থেকে কিংবা প্যারাসুট বিহীন ৩৫,০০০ ফিট উচ্চতা থেকে।

অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

0 Comments

দয়া করে নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন ??

নটিফিকেশন ও নোটিশ এরিয়া